সাখাওয়াত ফারহান ||

বাংলাদেশ বিগত চার বছরে ধর্ষণের ঘটনা অনেক। ২০১৭ সালে ২০১৯ এর মধ্যে হাজার- খানিক ধর্ষণ এর মামলা হয়েছে।
এতে নারীর পাশাপাশি শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ও প্রভাব লক্ষনীয়।

চলতি বছরে প্রথম চার মাসে (২৯ এপ্রিল পর্যন্ত) ২৯০টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে যথাক্রমে ৫২, ৬০, ৫২টি করে মোট ১৬৪টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। আর শুধু এপ্রিল মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৫টি শিশু। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৭০টির বেশি শশু ধর্ষিত হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিএসএএফের তথ্য অনুযায়ী গত ৪ মাসে সর্বনিম্ন আড়াই বছর বয়সের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

বিএসএএফের তথ্যে আরো বলা হয়েছে, গত বছরের চেয়ে এ বছর (প্রথম চার মাসে) শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪%। উল্লেখ্য, সব ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ পায় না। তাই প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে বলে বিএসএএফ মনে করে।

বিএসএএফের মতে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধির কারণ মূলত, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, দুর্বল চার্জশিট, শিশুর পক্ষে সাক্ষী-সাবুদ না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে দরিদ্র অভিভাবকের আসামির সাথে আপস করতে বাধ্য হওয়া এবং সর্বোপরি সামাজিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ইত্যাদি। এসব প্রতিহত করতে আরো ত্বরিত হস্তক্ষেপ এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও দফতরগুলোকে অনুরোধ জানানো হয় বিএসএএফের পক্ষ থেকে। তারা বলেন, শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধে দ্রুত বিচারের আওতায় শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো নিতে হবে। প্রচলিত আইন সংশোধন করে শিশু ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সেই সাথে রায় দ্রুতগতিতে কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করতে হবে। বিষয়টি এখন আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করার পর্যায়ে নেই। শিশু ধর্ষণের অপরাধ জামিন অযোগ্য করা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যে জানা যায় ২০১৬ সাল এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ৮শর বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। দেশে ধষর্ণের মামলায় বিচারের হার নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়। প্রত্যেকটা জায়গায় একজন মহিলাকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে অথবা একটা কিশোরীকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে ধর্ষিত হয়েছে। যেটা আমরা চাই আসামীই প্রমাণ করবে যে সে নির্দোষ।

ধর্ষিত হয়ে চার বছর মামলা চালিয়ে বিচার পেয়েছেন এমন একটি মেয়ে বিবিসিকে বলেন, মাদ্রাসার একজন শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন। নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ভিকটিম বলেন,
“আমার টিচার ছিল। ঘটনা হওয়ার পর আমরা পুলিশের কাছে যাই নাই। অনেক পরে জানাজানি হইছে। আমার ফ্যামিলিও জানতো না। আমারে ভয় দেখানো হইছিল। আর আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। জানার পরে আমার আব্বু কোর্টে মামলা করে। মেডিকেল রিপোর্টে আসছিল আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিলাম। আমার ঘটনা জানাজানির পরেই নিরাপত্তার জন্য আমি মহিলা আইনজীবী সমিতির শেল্টারে ছিলাম।”ধর্ষণের শিকার নারীকেই দোষী করার একটা প্রবণতা এদেশের সমাজে আছে সেটিও এ ভিকটিমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিনি আরো বলেন “আমার এলাকার মানুষও সবসময় আমার বিরুদ্ধে ছিল। তারা চাইছিল আমাদের এলাকা থেকে বের করে দেয়ার।”

এমন ঘটনার সংখ্যা আরও অনেক এর মধ্যে কিছু প্রকাশিত আর অপ্রকাশিতর সংখ্যায় অনেক।
শুধু তাই নয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ধর্ষণের ঘটনা জানতে পাওয়া যায় যার মধ্যে
২০১১ সালের ৫ই জুলাই ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের দশম শ্রেনীর এক ছাত্রীর পরিবার উক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের
অভিযোগে মামলা করা হয়।
২০১৫ সালে পরিমল জয়ধরকে উচ্চ আদালত যাবজ্জীবন কারাদন্ড শাস্তি প্রদান করে।

৩ ডিসেম্বর ২০১৭ তে সাজেশন দেয়ার নামে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নবম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো জায়গায় ধর্ষণের প্রভাব আনেক বেশি।

২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়ার মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন।

বিগত কিছু বছরে ২০৮৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৩১ জন। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যা-সহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে তুলে ধরা তথ্যে জানা গেছে, মোট নির্যাতন ২০৮৩জনের মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৩১ জন, গণধর্ষণের শিকার ১১৩ জন এবং হত্যা হয়েছে ২৭৬ জন।

ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারাদেশে ৮টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, পুলিশি ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়। ২০০১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩শ ৪১টি যৌন নির্যাতনের মামলা হয়েছে যার মধ্যে ৫শ ৭৮টি বিচার হয়েছে এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৬৪টি ঘটনার।
২০১৬ সালেয় এক হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ হয়েছে।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনে নজিরবিহীন রেকর্ড হতে চলেছে দেশে। হঠাৎ যেন মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই যেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরাও।
ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। চলতি বছরের গত সাড়ে তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
খোদ পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন।