নিজস্ব প্রতিবেদক ||মুন্সী নাইম রেজভী:

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও, এখনো বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় এবং ভীতি রয়েছে। ক্যাম্পাসে অব্যাহত বিক্ষোভ আন্দোলন চললেও, ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা বলতে চান না কোন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক।

পুরো ক্যাম্পাসেই যেন একটা নীরব ভীতি ছড়িয়ে রয়েছে।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ভয়াবহ মারধরে আবরার ফাহাদের মৃত্যু হলেও, শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি বুয়েটের হলগুলোয় নতুন নয়। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হয়ে গেলে তারাও হামলার শিকার হতে পারেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী বলছিলেন, এখানকার প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের জুনিয়র স্টুডেন্ট না চাইলেও প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মিছিলে যেতে হয়। তা সে ওই মতাদর্শে বিশ্বাসী হোক না হোক। যেতে হবেই বাধ্য সে।’

কিন্তু না গেলে কি হবে?
”বুয়েটে হাত তোলা, এই বিষয়টা আনকমন না। চড়-থাপ্পড় দেয়া, বা স্ট্যাম্পের মার বলেন, এগুলো করা হয়। ছাদে নিয়ে মারধর করা হয়।”

আরেকজন শিক্ষার্থী বলছেন, ”সিরিয়াস নির্যাতন যেগুলো হয়, তা হলো কাউকে পছন্দ হলো না, অথবা কারো প্রতি তার ব্যক্তিগত আক্রোশ, অথবা ফেসবুক পোস্ট, এসব কারণে যদি মারা হয়, শেষ পর্যন্ত তাকে শিবির নাম লাগিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।”

”যদি কেউ প্রতিবাদ করে, তাকে আবার শিবির অভিযোগ করে অন্তত হল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যদি হল থেকে বের করে দেয়া হয়, তাকে প্রশাসন থেকেও কেউ সাহায্য করবে না। এ কারণে এসবের কেউ প্রতিবাদও করে না।”

শুধু বুয়েট না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলে জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনৈতিক একটি বড় অনুষঙ্গ আবাসিক হলের আসন পাওয়ার ব্যাপারটা
ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনায় প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরছেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা
আসন সংকটের কারণে প্রথম বর্ষে অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই আসন পাওয়া কঠিন আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এসব শিক্ষার্থীকে গণরুম বা হলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ হেল বাকী বলছেন, ”হলে একটা ছেলেকে রাজনৈতিকভাবেই উঠতে হবে। লিগ্যালি শুধুমাত্র বিজয় একাত্তর হল আর মেয়েদের চার পাঁচটি হলে ওঠা যায়। আর কোথাও লিগ্যালি উঠতে দেয় না। ফলে ছেলেদের হলগুলোয় যখন আপনি উঠবেন, আপনাকে বাধ্যতামূলকভাবে রাজনীতি করতে হবে, প্রোগ্রামে যেতে হবে। প্রশাসনিকভাবে কোন সিট দেয়া হয়না, রাজনৈতিকভাবেই সিট দেয়া হবে।”

রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ছাড়া প্রথম বর্ষে হলে ওঠা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

কেউ যদি হলে ওঠার পরে রাজনীতি না করে?
”তাহলে আমি হলে থাকতেই পারবো না। আমাকে মেরে বের করে দেয়া হবে। ফার্স্ট ইয়ারে আমাকে গণ রুমে উঠতে হবে। ”

আরেকজন শিক্ষার্থী মাহাদি হাসান বলছিলেন, গণরুমে ওঠার পর বড় ভাইদের সন্তুষ্ট করতে না পারায় কীভাবে তিনি ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন।

”ফার্স্ট ইয়ারে তো ছাত্রলীগের সঙ্গে রাজনীতি করেছি। সেকেন্ড ইয়ারের ঘটনা। ওই দিনও ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। রাত একটার দিকে হলের কিছু বড় ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। এর কয়েকদিন আগে আমাকে একজন বড় ভাই সিগারেট আর ক্যান্টিন থেকে ভাত এনে দিতে বলেছিল। আমি তাতে রাজি হইনি।”

”সে জন্য আমাকে ডেকে নিয়ে ফোন কেড়ে নিয়ে বাঁশের কেল্লা পেজে ওরাই লাইক দিল। এরপর আমাকে রাত একটা থেকে তিনটা রড দিয়ে ষ্ট্যাম্প দিয়ে পর্যন্ত মারধর করে পুলিশ ডেকে শিবির বলে ধরিয়ে দিলো। পরে ক্যাম্পাসের সহপাঠী, পরিবারের সদস্যরা এসে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে,” তিনি বলছেন।

যে কোনো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলের নিয়ন্ত্রণও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হাত চলে যায়।

এরপর থেকে ওই হলের ছাত্র ওঠা থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকে এসব সংগঠনের হাতে। অতীতে এরকম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।