লঞ্চের প্রেম জলে, মেঘার ঠাঁই কবরে, মাহিবী কারাগারে!

০৫ ডিসেম্বর, ২০১৯,
নিজস্ব প্রতিবেদক ।। নাঈম হাসান:

বরিশালের পথে চলছে এমভি সুন্দরবন লঞ্চ। লঞ্চের একটি কেবিন কক্ষে ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী সায়মা কালাম মেঘা ও তাঁর প্রেমিক মাহিবী হাসান। পুরো কক্ষ লাল বেলুনে ভর্তি। চলছে কেক কাটা আর পার্টি স্প্রে ছিটিয়ে মাহিবীর জন্মদিন উদযাপন।
কেক কাটা শেষ হতেই উচ্ছ্বসিত মেঘা প্রেমিক মাহিবীকে বলেন, ‘উইল ইউ ম্যারি মি?’ মাহিবীর উত্তর, ‘ইয়েস।’ এরপর মেঘা ‘কবুল’ বলতে বললে তিনবার কবুল বলেন মাহিবী। পরে জন্মদিনের উপহার হিসেবে প্রেমিকের আঙুলে আংটি পরিয়ে দেন মেঘা। এরপর চলে একজন আরেকজনকে খাইয়ে দেওয়া আর খুনসুটির গল্প। মেঘার মুঠোফোন দিয়ে করা ভিডিওতে এসব দৃশ্য দেখা যায়।
মেঘা ও মাহিবীর এ রকম লঞ্চযাত্রা ছিল নিয়মিত ঘটনা। মেঘার ঢাকা থেকে গ্রামে ফেরা কিংবা গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার সময় দুজন একসঙ্গেই হতেন লঞ্চের যাত্রী। শুধু মেঘার জন্যই প্রায় সময় ঢাকায় আসতেন মাহিবী।
সায়মা কালাম মেঘার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার শ্মশানঘাট রোডে। ইডেন কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগে পড়তেন তিনি। মেঘার পাশের ভিআইপি রোডের বাসিন্দা মাহিবী হাসান। বরিশালের হাতেম আলী কলেজে লেখাপড়া করতেন তিনি। তাঁর বাবার নাম মৃত নফিজুর রহমান।
ঝালকাঠিতে থাকাকালে ২০১৬ সালে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক আরো গভীর হয়। নিয়মিত কথা চলত মুঠোফোনে। একসময় মুঠোফোনের মাধ্যমে মজার ছলে বিয়েও করেন তাঁরা। সেই ফোন রেকর্ডিংয়ে প্রথমে মাহিবী বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদের মেয়ে সায়মা কালাম মেঘাকে ২০০১ টাকা দেনমোহর দিয়ে আমি মাহিবী হাসান বিবাহ করিলাম।’ এরপর তিনবার কবুল বলেন মাহিবী। একইভাবে সায়মা কালাম মেঘাও কবুল বলেন।
সায়মা কালাম মেঘা ২০১৭ সালে ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন। এর পর থেকে মাহিবী প্রায়ই ঢাকায় যাওয়া-আসা করতেন। মেঘা থাকতেন রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায়। মাহিবী হাসান থাকতেন ঝালকাঠির নিজেদের বাড়িতে। মাহিবী ঢাকায় এলে দুজন একসঙ্গে কেনাকাটা করতেন। আত্মীয়স্বজনের বাসায় সময় কাটাতেন। শেষে মেঘাকে নিয়ে লঞ্চের কেবিনে করে বরিশালের পথে রওনা হতেন।
একটা সময় মেঘা আর মাহিবীর এই সম্পর্কের কথা জেনে যায় দুজনের পরিবার। বিয়ের ব্যাপারেও সম্মতি দেয় তারা। পরিবারের সম্মতিতে মেলামেশা আরো বাড়তে থাকে তাঁদের। কিন্তু পরে মাহিবীর মা তাঁদের এ সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি। তাই তাঁরা দুবার বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েও সম্পন্ন করতে পারেননি। বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে কেনাকাটাও করেছিলেন মেঘা। বিয়ে উপলক্ষে চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে মেঘা তাঁর বন্ধুদের দাওয়াত দিলেও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময়মতো আসেননি মাহিবী।
এর পরে শুরু হয় মাহিবী আর মেঘার মধ্যে ঝগড়া। মেঘাকে অপমান ও কটু কথা বলে মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন মাহিবী। একটা সময় মেঘাকে বলেন, ‘আমার বিদেশ যেতে ১০ লাখ টাকা লাগবে। তোমার বাবার কাছ থেকে এই টাকা এনে দেবে। না হলে তোমাকে আমার বিয়ে করা সম্ভব না।’ এই কথা মেঘা তাঁর মা রুবিনাকে জানালে তিনি গত ১৫ এপ্রিল মাহিবীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের লোকজনকে জানান।
পরে মাহিবীর মা ঝালকাঠির কীর্তিপাশা হাসপাতালের নার্স সেলিনা নফিজ কোনো শর্ত ছাড়াই ছেলের বিয়ে দিতে রাজি হন। তবে প্রথমে রাজি হলেও পরে আবার মুখ ফিরিয়ে নেন মাহিবীর মা। এরপর মেঘাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন মাহিবী। এতে পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েন মেঘা। বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল, বিকেল। আত্মহত্যার আগে কাঁঠালবাগানের বাসায় বসে মেঘা নিজের হাত কেটে তা ভিডিওকলে মাহিবীকে দেখান। তবু বেঁচে থাকার উৎসাহ না পেয়ে কিছু সময় পর ঘরের ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়েন মেঘা। সেই দৃশ্যও মাহিবী হাসান দেখেন ভিডিওকলের মাধ্যমে। এ ঘটনা ঘটে বিকেল ৫টার দিকে। ৫টা ৯ মিনিটে মেঘার মা রুবিনা বেগমকে মুঠোফোনে এ ঘটনা জানান মাহিবী হাসান।
মৃত্যুর আগে লেখা মেঘার ‘সুইসাইড নোট’
আত্মহত্যার আগে মেঘা একটি লেখা লিখে তাঁর ব্যাগের ভেতরে রেখে যান। ওই সুইসাইড নোটে তিনি লিখেন, ‘আমি বাঁচতে চাইছিলাম, কিন্তু মাহিবী আর ওর মা আমারে বাঁচতে দেয় নাই। আমি মাহিবীর কাছে বারবার কুত্তার মতো যাই, আর ওর মা-বোন আমারে যা তা বলে। আব্বু-আম্মু আমারে মাফ কইরা দিও। আমার লাশের আশপাশেও যেন মাহিবী আসতে না পারে।’
…………………সুত্রঃ-NTV