স্বীকারোক্তি আদায়ে ‘নির্যাতনের’ বিবরণ দিলেন খলিল

নারায়ণগঞ্জে ‘ধর্ষণ-হত্যার দায়’ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেওয়া তিন আসামির মধ্যে নৌকার মাঝি খলিলুর রহমান জামিনে মুক্ত হয়ে বলেন, ‘ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি’ দিতে তাকে বাধ্য করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার হওয়ার পর থানায় পুলিশের নির্যাতনের কারণে ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছেন বলেও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি। বুধবার জামিনে মুক্ত হওয়ার পর খলিল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে মুখে গামছা বেঁধে অনবরত পানি ঢালছে। পানি ঢালার কারণে দম বন্ধ হয়ে যেত। মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য বারবার মুখে গামছা বেঁধে পানি ঢেলে নির্যাতন করেছে। যদি স্বীকারোক্তি না দিই তাহলে আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এভাবে যদি কাউকে নির্যাতন করা হয় তাহলে যে কেউ মারা যাবে। আমাকে মারধর, টর্চার করে তিন দিন থানার লকআপে আটকে রেখে নির্যাতন করে শেখানো স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে।’ গত ৪ জুলাই এক কিশোরী নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। সদর থানায় মামলা করে তার পরিবার। পুলিশ খলিল, আবদুলস্নাহ্‌ ও রকিব নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তারা আদালতে জবানবন্দি দেন। সেখানে তারা ‘অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার’ দায় স্বীকার করেন। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই শামীম আল মামুন। এদিকে ঘটনার ৫১ দিন পর ২৩ আগস্ট ওই কিশোরী ফিরে আসে। আদালতের নির্দেশে সে এখন পরিবারের জিম্মায় আছে। ফিরে আসার পর কিশোরী আদালতে বলেছে, ইকবাল নামে এক যুবককে বিয়ে করে বন্দর এলাকার এক ভাড়া বাড়িতে সংসার পেতেছিল সে। খলিল বলেন, ‘আমি ঘাটে নৌকা চালাইতেছিলাম। ওইদিন এসআই শামীম স্যার এসে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। সদর থানায় আমার সামনে দুই ছেলেকে (আবদুলস্নাহ্‌ ও রকিব) দেখিয়ে বলে, তুই ওদের চিনিস?’ তখন আমি বলি, তাদের আমি চিনি না। তখন আমাকে মারধর শুরু করেন শামীম স্যার। ‘আমি ওই দুই ছেলে ও কিশোরীকে চিনি না। জীবনে তাদের দেখিনি। তবু শামীম স্যার আমাকে মারধর করেন আর বলেন, ‘তুই মিথ্যা কস।’ এভাবে আমাকে থানার লকআপে তিন দিন আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।’ খলিল পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার একরামপুর এলাকায় ধনু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া বাসায় থাকেন। বাসা থেকে পাঠানো খাবারও খলিলকে দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। খলিলের বাবা আবদুল গফুর বলেন, ‘দুদিন থানায় ভাত দিয়েছি। পরের দিন ভাত নিয়ে গেলে রাখেনি পুলিশ। পুলিশ আমাগো দেখা করতেও দেয় নাই।’ খলিল এখন অসুস্থ বলে তিনি নিজে ও তার পরিবার জানিয়েছে। খলিলের স্ত্রী শারমিন বেগম বলেন, খলিল বুধবার জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘এক্স-রে ও অন্য বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু অনেক টাকা লাগবে দেখে পরীক্ষা না করিয়ে বাড়িতে ফেরত নিয়ে এসেছি। আগে থেকেই তার অসুখ ছিল। মারধর করে আরও অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছে।’ শারমিন বলেন, প্রতিবন্ধী এক মেয়েসহ তিন মেয়ে নিয়ে তার পরিবার। স্বামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি। অভিযোগ সম্পর্কে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খলিলকে ৮ আগস্ট বিকালে মামলার আটক করেন এসআই শামীম। পরদিন আদালতে পাঠানো হলে খলিল স্বীকারোক্তি দেন। মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। আলোচিত এ ঘটনায় শামীমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছে পুলিশের তদন্ত কমিটি। জেলার পুলিশ সুপার ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। বিডিনিউজ