২ হাজার ২০০ মিটার উঁচু ভবনেও উঠতে পারে এডিস মশা

মাহমুদুল হাসান নাহিদ || চট্টগ্রাম : জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের মতবিনিময় সভা। চট্টগ্রাম: ১০০ গজ উড়ে বিশ্রাম নিতে নিতে এডিস মশা ২ হাজার ২০০ মিটার উঁচু ভবনেও উঠতে পারে। তাই বহুতল ভবনের বাসিন্দারাও ডেঙ্গুর ঝুঁকিমুক্ত নন। বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের উদ্যোগে ‘এডিস মশা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়। কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা-গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন বিপিএ’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি প্রফেসর নাসির উদ্দিন মাহমুদ, নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া প্রমুখ। কমিটির সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত জ্বর। যার কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় জ্বর হলেই ডেঙ্গুর টেস্ট করা দরকার। ডেঙ্গু রোগীর প্রধান চিকিৎসা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত, দেশের সব ডাক্তারদের হাতে-কলমে ১-২ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এডিস ইজিপ্টি মশার ওড়ার ক্ষমতা মাত্র ১০০ গজ। তাই মানুষের বাসা-বাড়িতে থাকতে পছন্দ করে। ঘরের অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা, শোবার ঘর, টয়লেট, আসবাবপত্রের নিচে, ভিতরে, ঝোলানো কাপড়, মশারির আড়াল ও দেয়ালে এবং অনেক সময় বাড়ির বাইরে ঘাস, গাছ ও লতাপাতায় এরা বিশ্রাম নেয়। ডিম পাড়ার সক্ষমতার জন্য এদের মানুষ বা বানরের রক্তের প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পুয়ের্টে রিকো শহরে এই মশা ৪০০ গজ পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে। রক্ত পান করার তিনদিন পর এরা ডিম পাড়ে। যেখানে ৩-৪ দিন পানি জমে থাকে যেমন: পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবনের আধার, ড্রাম, বালতি, ইটের যে অংশে লোগো থাকে, ফ্রিজের নিচের ট্রে, ছোট-বড় কৌটা, পাত্র, বাড়ির ছাদ, কার্নিশ, বাঁশের খোপ, ডাবের খোল, ফুলের টব, কনডেন্স মিল্কের টিন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদ, ওয়ানটাইম কাপ-পিরিচ ইত্যাদিতে জমা পানির ওপরে শ্যাওলার স্তর তাদের লার্ভার খাবার। অনেক সময় পানি শুকিয়ে গেলেও ৬-১২ মাস লার্ভা বেঁচে থাকবে এবং মশার জন্ম হবে। এ মশা বেশি শীত সহ্য করতে পারে না। এ সময় ডিমও পাড়ে না। ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি তাপমাত্রায় মারা যায়। মশা কামড়ালেই ডেঙ্গু হবে না। মশাটি ডেঙ্গুবাহী হতে হবে। একজন ডেঙ্গু রোগীর উপসর্গ দেখা দেওয়ার ২৪-৪৮ ঘণ্টা থেকে ৫ দিনের মধ্যে কামড়াতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মাত্রায় ভাইরাস ঢোকাতে হবে। ভাইরাসসমৃদ্ধ রক্ত মশার শরীরে ৮-১০ দিন থাকে। ভয়াবহ হলো, ডেঙ্গুবাহী মশা ডিম পাড়লে সব বংশধর ডেঙ্গুবাহক হবে। তিনি বলেন, এডিস ভয়হীন মশা। এদের বুকে ও পায়ে সাদা ও হলুদ রৌপ্য বর্ণের ডোরা কাটা দাগ থাকে বলে এদের টাইগার মশাও বলা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, প্রশাসন ও জনগণকে নিয়ে সমন্বিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি করার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া সকাল-বিকেল-রাতে শিশুদের মশারির ভেতর রাখা, দরজা-জানালায় নেট লাগানো, সারা শরীর ঢেকে কাপড় পরা, মশারি ও পর্দায় মশানিরোধক ওষুধ লাগানো যেতে পারে। সাংবাদিক সুভাষ দত্ত বলেন, জীবন বাঁচানো প্রধান কর্তব্য। ১০ হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছেন। দেশের সব ডাক্তারকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে যে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তা কার্যকর কিনা! যদি অকার্যকর হয় তবে নতুন ওষুধ আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সক্রিয় হতে হবে. ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আজ সকালে ৪ জন রোগী ছিলেন। তারা বিপদমুক্ত। তবে ডেঙ্গু আসলেই ভয়াবহ। এক শয্যায় ৪-৫ জন রোগী চমেকের শিশু ওয়ার্ডে। মহামারী হলে সড়কে শামিয়ানা টাঙিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষার দরকার নেই। যদি উপসর্গ দেখা না যায়। ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়, অফিসে মশা নিধন করতে হবে। ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের কারণে ডেঙ্গু সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা জানান এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ১৪-২৮ দিন স্বচ্ছ পানি জমিয়ে রাখা হয়। এখানে ডেঙ্গু প্রজনন হওয়ার শঙ্কা আছে। তাই এ ক্ষেত্রে ছাদের পানি নেট দিয়ে ঢেকে রাখবেন না। ওই পানিতে ভবনের ক্ষতি না হয় এমন ওষুধ মেশানো যায় কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।