সংগীত নৃত্য কবিতায় বর্ষাবন্দনা

আষাঢ়ের ২৭ দিনটি পেরিয়ে গেছে। শ্রাবণ আসন্ন। এই সময়ে শহর কিংবা গ্রামে, বনজঙ্গল বা নদীর পাড় বর্ষার চোখজুড়ানো রূপ মুগ্ধ করে। ভালো লাগে বর্ষার সদ্যস্নাত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। ভালো লাগে আকাশ, অবারিত মাঠ, টলমলে জলের পুকুর, ভেজা সবুজ পাতা, ঘাস। বৃহস্পতিবার রাজধানীতেও ছিল বর্ষার স্বরূপ উপস্থিতি। থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছিল সারা দিন। মেঘমেদুর সন্ধ্যায় দিনটিকে সার্থক করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষামঙ্গল শিরোনামের আয়োজন। এ আয়োজনে গানের সুর ও নৃত্যের ছন্দ এবং কবিতার দীপ্ত উচ্চারণে বর্ষা উদ্‌যাপন করলেন শিল্পীরা।

আধুনিক গান পরিবেশন করেন রফিকুল আলম  । ছবি: প্রথম আলো

বৃষ্টিধারা ও সংগীতের সুরের অপূর্ব সংমিশ্রণের যন্ত্রসংগীতের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ‘বর্ষামঙ্গল’ নামের মনোমুগ্ধকর এই আসর। প্রথমে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। বলেন, ‘ষড়্ঋতুর দেশ আমাদের এই রূপসী বাংলাদেশ। দুই মাস পরপর ঋতু এসে এ দেশের রূপের সুষমায় ভিন্নতা এনে দেয়। বৈচিত্র্যে ভরা এমন ঋতুর দেশ পৃথিবীর আর কোথাও নেই।’ তিনি আরও বলেন, ইট-কাঠের যান্ত্রিক এই নগরীর শিশুরা আবহমান বাংলার অনন্য ঋতু বর্ষার সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত। নগরের মানুষের কথা বিবেচনা করেই আজকের এ আয়োজন। সন্তানদের ঋতুবৈচিত্র্য উপভোগ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘আমাদের অসাধারণ ছয়টি ঋতু, কিন্তু শহরে বসবাসে আমরা তা উপভোগ করতে পারি না। ছয়টি ঋতু নিয়ে যেসব শিল্প আমরা নির্মাণ করেছি, তা বিশ্বে বিরল।’ এখন থেকে প্রতি দুই মাস অন্তর নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিটি ঋতু উদ্‌যাপনের ঘোষণাও দেন একাডেমির মহাপরিচালক।আধুনিক গান পরিবেশন করেন রফিকুল আলম । ছবি: প্রথম আলোসংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। গানে গানে স্বাগত জানানো হয় আষাঢ়কে। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেওয়া’, ‘অমৃত মেঘের বারি’, ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদরদিনে’ ‘গহন ঘন ছাইল’ ইত্যাদি গান সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশন করেন একাডেমির নিজস্ব শিল্পীরা। এরপর ‘পরদেশী মেঘ’, ‘শাওন গগন ঘোর ঘনঘটা’ ও বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’ গানের কথায় সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন একাডেমির নৃত্য শিল্পীরা। নাচে, গানে ও আবৃত্তিতে বর্ষা ঋতুই যেন মূর্ত হয়ে উঠল সমগ্র মিলনায়তনজুড়ে।

সুরে সুরে বর্ষা উদ্‌যাপন করলেন শিল্পীরা ছবি প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে একক কণ্ঠে মোহনা দাস গেয়ে শোনান ‘মেঘ বলছে যাবো যাবো’, হিমাদ্রি রায়ের কণ্ঠে গীত হয় ‘সখী বাঁধলো বাঁধলো ঝুল নিয়া’, সোহানুর রহমান পরিবেশন করেন ‘এই মেঘলা দিনে একলা’, সূচিত্র সূত্রধর গেয়ে শোনান ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো’, রোখসানা আক্তার রূপসার কণ্ঠে গীত হয় ‘আষাঢ় মাইসা ভাসা পানি রে’, রাফি তালুকার গেয়ে শোনান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান পরিবেশন করেন নবনীতা, নজরুলের বর্ষার গান গেয়ে শোনান ইয়াসমীন মুসতারী, আধুনিক গান পরিবেশন করেন রফিকুল আলম এবং লোকগীতি পরিবেশন করেন শিল্পী আবু বকর সিদ্দীক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিল্পী কৃষ্টি হেফাজ।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিল্পীরা আকাশি-নীল রঙের শাড়ি আর খোঁপায় ফুল গুঁজে সেজেছিলেন। ছেলেদের পোশাকেও ছিল ভরা বর্ষার সৌন্দর্য—নীল পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা। বর্ষার কবিতার পঙ্‌ক্তি আর ছবিসংবলিত টি-শার্ট পরেও অনুষ্ঠানটি উদ্‌যাপন করেন কেউ কেউ।