সিফাতুল ইসলাম :

৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৭, দলপতি হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে জিম্বাবুয়ের হারারে তে ৪ ম্যাচের একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ। নিয়মিত ওপেনার মেহরাব হোসেন জুনিয়রের বাজে ফর্মের কারনে আরেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফিসের সাথে আরেকজন তরুণ ওপেনার নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় ততকালীন বাংলাদেশ দলের নির্বাচকরা। ফলে ঐ দিন বাংলাদেশ ওডিআই দলের ৮৩ তম সদস্য হিসেবে অভিষেক হয় এক তরুণ বাহাতি ওপেনারের। কিন্তু সেই ম্যাচেও অনেকটা হতাশ হয় নির্বাচকগণ, মাত্র ৫ রানে সাজঘরে ফিরে যান নতুন ওপেনার। কিন্তু তবুও আস্থা হারায়নি নির্বাচকরা দ্বিতীয় ম্যাচে আবারো খেলানো হয় তাকে। সেই ম্যাচে ৩২ বল মোকাবেলা করে ৩০ রান করে আউট হয়ে ফিরে যান আবারো। কিন্তু পূর্বের থেকে ভালো এবং আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারনে চোখে পরে সবার। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সেই তরুণ ওপেনারের। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল খান।
একই বছর কেনিয়ার বিপক্ষে ১৭ তম সদস্য হিসেবে টি২০ ও পরের বছর (৪ জানুয়ারি ২০০৮) শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫১ তম সদস্য হিসেবে টেস্টে অভিষিক্ত হন এই ওপেনার।
২০০৭ সালেই ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের মাধ্যমে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন তিনি যেখানে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ফেবারিট ভারতের বিপক্ষে ৫৩ বলে ৫১ রানের এক অসাধারণ ইনিংস খেলেন এই ওপেনার যা ছিল বিশ্বকাপে তার প্রথম ফিফটি। কিন্তু ঐ ম্যাচ পরেই কিছুটা লাইন হারিয়ে ফেলেন তিনি এবং পরের টানা তিন ম্যাচে দুই অঙ্কের কোঠায় যেতে পারেন নি এই ওপেনার। এরপর নিজেদের ৫ম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৮ রাম করেন তিনি। এবং সেই বিশ্বকাপে নিজের শেষ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯ রান এবং এর আগের ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৮ রান করেন তিনি।
সেই বছর বিশ্বকাপে বাজে সময় গেলেও এর পর পরই ঘুড়ে দাড়ান তিনি। এরপর থেকে চলতে থাকে তার ক্যারিয়ারের নানান চড়াই উতরাই। এরই মাঝে খেলেন ঘড়ের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপ এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে খেলেন নিজের ৩য় বিশ্বকাপ। এর আগে ২০১২ সাল থেকে প্রচুর খারাপ সময় পার করতে থাকেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এই ওপেনার। বিশেষ করে তিনি সবথেকে বেশি ব্যার্থ আইসিসির বড় কোন ইভেন্টে। কিন্তু সেখান থেকে ঘুড়ে দাড়ান ২০১২ এশিয়া কাপে যেখানে চার ম্যাচে পরপর চারটি অর্ধশতক করেন তিনি।
এরপর আবার ২০১৩-১৪ সালে একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয় তামিম ইকবালের জন্য। এবং সেই ধারায় একইভাবে বাজে ফর্মে ছিলেন ২০১৫ বিশ্বকাপেও।
সেই বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫ ব্যাতিত আর কোন বড় ইনিংস ছিন না তার।
কিন্তু সকল সমালোচনা ঝেড়ে নিজেকে বদলে আবারো স্বরূপে ফিরেন পাকিস্তান সফরে যেখানে দুটি শতক করেন তিনি।
এরপর থেকে দারুণ করতে থাকেন তিনি আর এরই মধ্যে বনে যান দেশসেরা ওপেনারের খেতাবে। তার আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে ইমরুলকে সাথে নিয়ে দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে টেস্টে ২০৯ রানের মাইলক অর্জন করেন এবং খেলেন ২০৬ রানের ইনিংস যা ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাকে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের মর্যাদা দেয়।
এর পরের বছর ভারতে অনুষ্ঠিত টি২০ বিশ্বকাপে প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে টি২০ তে শতরান করেন তিনি যা এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি২০ তে কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংস।
এরপর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে তিন ফরমেটে ১০০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এছাড়াও শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তি জয়াসুরিয়াকে পেছনে ফেলে এক মাঠে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান সংগ্রহের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। যা তাকে নিয়ে যায় অন্য এক উচ্চতায়।
কিন্তু ২০১৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের পর থেকেই নিজের ফর্ম হারিয়ে ফেলেন তিনি। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে তার ধীর গতির ব্যাটিং সৃষ্টি করে নানা সমালোচনার। সেই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬২, উইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৮ রানের ইনিংস ব্যাতিত আর কোন দেখার মত ইনিংস ছিল না তার। সেখানে মূলত ওপেনিং ব্যার্থতা দলকে ভুগিয়েছে সারা আসর জুড়ে যার প্রভাব পরেছে প্রথম রাউন্ডে বাংলাদেশের বিদায়।
এরপর বিশ্বকাপ থেকে ফিরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে অধিনায়কত্বের ভার পরে তার উপর যেখানে বাজেভাবে হোয়াইট ওয়াশ হয় বাংলাদেশ দল। এরপর দলথেকে ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ২০১৯ বিপিএল দিয়ে খেলায় ফিরেন তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি২০ ও টেস্ট সিরিজে থাকলেও সেখানে ব্যার্থ ছিলেন তিনি। কিন্তু এর আগেই বিসিএল এ দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে ৩০০ রান করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। কিন্তু তবুও ব্যার্থতা ঘুরপাক খাচ্ছিলো তার চারদিকে। তাইতো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল তার ফর্মে ফেরার সিরিজ যেখানে নতুন মাইলফলক থেকে মাত্র ২৭ রান দূরে ছিলেন তিনি। আর তাইতো নিজেদের প্রথম টেস্টেই এই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের ১ম ও বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের ৫০ তম ব্যাটসম্যান হিসেবে তিন ফরমেটে একত্রে ১৩০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এই ম্যাচে ব্যাক্তিগত রান যখন ২৭ তখনই পূর্ণ হয় তার এই মাইলফলক। এই ম্যাচে ৪১ রান করে সাজঘরে ফিরেন তিনি।
এই ম্যাচ মিলিয়ে তিন ফরমেটে তামিম মোট ৩৪১ ম্যাচে মোট ৩৯৪ টি ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে ১৩০১৪ রান তুলেন তিনি যা কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান যেখানে তার গড় ৩৪.২৫। তিন ফরমেটে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২১ টি শতকের মালিক তিনি যেখানে রয়েছে একটি ডাবল হান্ড্রেড এবং মোট অর্ধশত রান করেন ৮১ টি ইনিংসে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংস পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ২০৬ রান।