শিক্ষাবর্ষ ৯ মাস করার প্রস্তাব ক্ষতি পোষাতে

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ এ সময়ের শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে অনলাইনে ও সংসদ টিভির মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পাঠের বাইরে। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ভাবছে না সরকার। সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে চলতি শিক্ষাবর্ষকে আগামী মার্চ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ পরের বছরের শিক্ষাবর্ষ হবে ৯ মাস। ওই বছরের সাধারণ ছুটি কমিয়ে তা সমন্বয় করা হবে। নভেম্বরে জেএসসি-জেডিসির পরীক্ষা তিন ঘণ্টার পরিবর্তে এক ঘণ্টার এমসিকিউ করা হবে। করোনাকালীন শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে এরকম প্রস্তাব দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু)। একই ধরনের প্রস্তাব তৈরি করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, ‘৫ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি রয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫ মাস ধরে বন্ধ। আগামী সেপ্টেম্বরে যদি স্কুল খোলা হয় তাহলে এক ধরনের প্রস্তুতি আর না হলে আরেক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এ বিষয়ে একটি সংশোধিত সিলেবাস তৈরি করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা পরিবর্তিত সময়ে কতগুলো ক্লাস নিতে পারবে- তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী ক্লাসের সঙ্গে পাঠ্য বিষয় লিংকেজ রয়েছে সেভাবে সংশোধিত সিলেবাস তৈরি করা এবং বছরের শুরুতেই আমরা সারা বছরের পাঠপরিকল্পনা নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেটাকেও রিভাইস করতে বলেছি।’

এ ব্যাপারে নেপের মহাপরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে রোববার ডিপিই ডিজির সঙ্গে কথা বলেছি। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে মিটিং করে কমিটি করে দেব। কমিটি নির্ধারণ করব- কতটুকু সিলেবাস পড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কবে স্কুল খুলবে এখনো বলা যাচ্ছে না। যে কারণে শিক্ষাবর্ষ বাড়ানো হতে পারে। মিটিংয়ে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বেডুর চারটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে- প্রথমত, সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সম্ভব হলে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত ক্লাস চালিয়ে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে পরের শিক্ষাবর্ষের সরকারি ছুটি কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। ছয় মাস ক্লাস নেওয়া সম্ভব হলে পাঠ্য বইয়ের অধ্যায়ভিত্তিক সব না পড়িয়ে বিষয়ভিত্তিক সাম্যক পাঠদান করা হবে। যাতে পুরো শিক্ষাবর্ষের পাঠের সাম্যক ধারণা পেতে পারে শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে এনসিটিবি একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরি করে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়ে দেবে। যাতে লার্নিং আউটকামগুলো অ্যাচিভ করা সম্ভব হয়। শর্ট সিলেবাসে পাঠদান শেষে পরীক্ষা নেওয়া। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের তিন ঘণ্টার পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি-জেডিসি) না নিয়ে শুধু এক ঘণ্টার এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া। এতে সব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই করতে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে সেভাবে প্র্রশ্ন করার গাইড লাইন তৈরি করে দিবে বেডু। অন্তত তিন মাস ক্লাস নেওয়া সম্ভব হলে সেক্ষেত্রে এ রকম প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয়ত, তিন মাস ক্লাস করা সম্ভব না হলে সেক্ষেত্রে স্কুলগুলো বার্ষিক পরীক্ষার মতো একটি পরীক্ষা নেবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা দেবে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই রাখতে হয় সেক্ষেত্রে আর পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না। চতুর্থত, শেষ পর্যন্ত উপরের একটি প্রস্তাবও যদি বাস্তবায়ন না করা যায় সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরের ক্লাসে অটো-প্রমোশন দেওয়া। আগের ক্লাসের যেসব শিখন ঘাটতি থেকে যাবে সেগুলোকে চিহ্নিত করে নতুন শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামের মধ্যেই শিখিয়ে দিতে হবে শিক্ষকদের।

এসব প্রস্তাবের ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, ‘বেডুর প্রস্তাব এখনো আমি পাইনি। পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সৈয়দ মাহফুজ বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে যে সময়টা নষ্ট হয়েছে সেটা রিকভারি করতে ৯ মাসে শিক্ষাবর্ষ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা বলেছি, ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত চলতি শিক্ষাবর্ষের সেশন বাড়িয়ে দিতে। ফেব্রম্নয়ারিতে সেশন শেষ করে মার্চে পরীক্ষা নিয়ে এপ্রিলে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করা যাবে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকে এমন কিছু কনটেন্ট আছে যেগুলো ষষ্ঠ শ্রেণিতে এক রকম, সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতেও অন্যভাবে পড়ানো হয়। এই কনটেন্টগুলো এক ক্লাসে কম পড়ানো হলেও পরের ক্লাসে সেটা ভালোভাবে পড়ানো সম্ভব। আবার কিছু কনটেন্ট থাকে এক ক্লাসেই শেষ হয়ে যায়, অন্য ক্লাসে পড়ানো হয় না। পাঠ্যপুস্তকের সে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শর্ট সিলেবাসে পড়িয়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো এখন পর্যন্ত অনুমোদন হয়নি। মন্ত্রণালয় বা মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি।’

বেডুর বিশেষজ্ঞ ওবাদুস সাত্তার বলেন, ‘আমাদের অ্যাসেসমেন্টটা এমন হওয়া উচিত যাতে লার্নিংগুলো নিশ্চিত হয়, সেজন্য আমরা চার ধরনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের কাজ করতে বলেছেন।’ তিনি বলেন, ‘সামাজিক, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো ভেবে আমরা প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। জেএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে আমরা এ প্রস্তাব করেছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে জেএসসিকে ফোকাস করে প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার বিষয়ে কোনো মতামত দেওয়া হয়নি। আশা করছি আগামী পাবলিক পরীক্ষার আগেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি ভালো হয়ে যাবে।’

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা সাব কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম আমিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পায়নি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত খেলাধুলায় কেটে গেছে। বলতে গেলে বই স্পর্শই করতে পারেনি। অনলাইনে যত ক্লাসই হোক সারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনলাইনে কাভার হয়নি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা চলছে। মানুষ জীবন ও জীবিকা নিয়েই ব্যস্ত। সংগত কারণে নভেম্বরের পরীক্ষা সিলেবাস শেষ না করে কীভাবে নেওয়া হবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, হয়তো সেশন পিছিয়ে যেতে পারে। এটাই বাস্তবতা। এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।