আসামের চূড়ান্ত নাগরিক পঞ্জী প্রকাশ হবে আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | সা’দ খোন্দকার:

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশ করা হবে আজ। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় অনলাইনে প্রকাশিত হবে এ নাগরিকপঞ্জি। এজন্য রাজ্যজুড়ে ‘সেবা কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে। যাদের ইন্টারনেট নেই, তারা ওইসব কেন্দ্রে গিয়ে তালিকা দেখতে পারবেন। এরই মধ্যে এ তালিকার খসড়া থেকে বাদ পড়েছে রাজ্যের প্রায় দুই লাখ মানুষ। আরও অনেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছে। গত চার বছর ধরে যাচাই-বাছাইয়ের পর আসাম সরকার এই তালিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। সংবাদসূত্র : এনডিটিভি, পিটিআই

গত বছরের জানুয়ারিতে এনআরসির প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে আসাম সরকার। প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ বাসিন্দা বাদ পড়ে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত সরকার। গত বছরের জুলাই এবং চলতি বছরের জুনে দুই দফায় প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে ৪১ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৩৬ লাখ মানুষ নিজেদের বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করে, আর প্রায় দুই লাখ মানুষের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে অন্যরা। এসব আপিল ও আপত্তির বিষয়ে শুনানি এখনো চলছে।

বাংলাদেশে থেকে বহু মানুষ অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে- এই দাবি তুলে কয়েক দশক আগে

আসামে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন শুরু হয়। অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যেই চার বছর আগে আসাম সরকার নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু করে। নাগরিকপঞ্জিতে ঠাঁই পেতে হলে বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেড়েছে। গত চার বছর ধরে সেখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নানা কাগজপত্র হাতে এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ছুটতে হয়েছে।

এদিকে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর যেকোনো রকম সহিংসতা মোকাবিলায় তৎপর হচ্ছে রাজ্য প্রশাসন। রাজ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজর রয়েছে। যাতে রাজ্যের কোনো প্রান্তে কোনো রকম সহিংসতা ছড়াতে না পারে। এজন্য সব জেলার পুলিশ সুপার ও কমিশনারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নজর রাখা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও।

আসামের পুলিশ জানায়, তারা নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। গুজবে কান না দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছে তারা। পুলিশ জানায়, জনগণের সুরক্ষাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, এনআরসি তালিকা প্রণয়ন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এনআরসির নিয়মানুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি ট্রাইবু্যনালে ভিনদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন, স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তার মাধ্যমে ‘ডি ভোটার’ বলে চিহ্নিত হন অথবা কোনো ব্যক্তি বা তার উত্তরসূরির যদি কোনো মামলা বিদেশি ট্রাইবু্যনালে মুলতবি থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এনআরসি আপডেট প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হবে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে গুঞ্জনে বিশ্বাস করবেন না। তালিকা থেকে কেউ বাদ পড়লেই তাকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হবে না। প্রত্যকেই বিদেশি ট্রাইবু্যনালে আবেদন করতে পারবে। আপিল করার জন্য অন্তত ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় পাবেন।

ওই মুখপাত্র আরও জানান, আপিল আবেদনের শুনানির জন্য রাজ্যে অন্তত এক হাজার ট্রাইবু্যনাল গঠন করা হবে। এরই মধ্যে ১০০ ট্রাইবু্যনাল গঠন করা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ ওই সংখ্যা দুইশ’র বেশি হবে। ট্রাইবু্যনালে হেরে গেলে যে কেউ হাইকোর্ট এবং সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারবে। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বন্দিশিবিরে নেয়া হবে না বলেও জানিয়েছে আসাম সরকার।

কিন্তু এত আশ্বাসের পরও আতঙ্ক কাটছে না লাখ লাখ আসামবাসীর মধ্যে। তালিকা থেকে বাদ পড়লে কী হবে, সেই অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্কেই সিঁটিয়ে রয়েছে বড় অংশের মানুষ। এ ছাড়া দরিদ্র-নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে নাগরিকত্বের লড়াই চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব হবে, সেই আশঙ্কাও করছে অনেকে।

আশঙ্কা অবশ্য দেশটির শাসক দল বিজেপির ভেতরেও রয়েছে। কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিই যে দলের হাতিয়ার, তাদের শাসনকালেই হিন্দুরা ‘দেশহীন’ হয়ে পড়বে- এটা পদ্ম শিবিরে কাছে উদ্বেগের তো বটেই, মত পর্যবেক্ষকদের। এরই মধ্যে আসামের অনেক বিজেপি নেতা সেই আশঙ্কা-উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যেও বলেছেন।

এনআরসি তালিকা থেকে রেকর্ডসংখ্যক মুসলমানকে বাদ দেয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার দেশটির ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (ইউএসসিআইআরএফ) এক বিবৃতিতে বলা হয়, আসামের নাগরিক তালিকা সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে ইউএসসিআইআরএফ।

১৯৬৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) ময়মনসিংহ থেকে মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার হাত ধরে আসামে এসেছিলেন দুলাল দাস। এখানে এসে কালের পরিক্রমায় থিতু হয়েছেন তারা। কিন্তু আবার নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের ঘটনায় আতঙ্ক গ্রাস করেছে দুলাল দাস ও তার পরিবারকে। শুধু দুলাল দাসই নয়, তার মতো ৪১ লাখ আসামবাসীর রক্তে বয়ে যাচ্ছে আতঙ্কের শীতল স্রোত। আতঙ্ক রাজ্যহীন, দেশহীন হয়ে যাওয়ার, আতঙ্ক-পাকাপাকিভাবে ‘বিদেশি’ বা ‘উদ্বাস্তু’ অথবা ‘অনুপ্রবেশকারী’ ছাপ পড়ার।

আসামে প্রথম নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সংশোধন হতে হতেই শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হতে চলেছে। তার আগে গত দুই বছরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে বহু মামলা হয়েছে। আন্দোলন-প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়েছে উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে। রাজনৈতিক তরজার পারদ তুঙ্গে উঠেছে। তার মধ্যেই চলেছে তালিকা সংশোধনের কাজ। তারপরও তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে অন্তত ৪১ লাখ মানুষের।